
দ্বন্দ্ব নিরসন, সংঘাত-সহিংসতা রোধ ও শান্তি-সম্প্রীতি চর্চার ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, তরুণ ও ছাত্রনেতাদের অর্জন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী বিস্তৃত পিএফজি’র নেতৃত্ব প্রদানকারী পিস অ্যাম্বাসেডরবৃন্দের অংশগ্রহণে আজ ২৯ জুন ২০২৪, সকাল ১০.০০টায়, কৃষিবিদ ইনস্টিউশন কমপ্লেক্স, ফার্মগেট, ঢাকায় ‘পিস অ্যাম্বাসেডর জাতীয় সম্মেলন-২০২৪’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দি হাঙ্গার প্রজেক্টের উদ্যোগে, ইউএসএআইডি’র সহযোগিতায়, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল এবং আইএফইএস-এর অংশীদারিত্বে অনুষ্ঠিতব্য উক্ত সম্মেলনে স্থানীয় নেতারা নিজ নিজ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘ঢাকা ঘোষণা’ উপস্থাপন করেন।

উল্লেখ্য, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বহুদলীয় প্ল্যাটফর্ম ‘পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ’ (পিএফজি) গঠনের মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছাসেবারভিত্তিতে দ্বন্দ্ব নিরসন, তথা সংঘাত-সহিংসতা রোধের মাধ্যমে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতি বৃদ্ধি এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে কাজ করছে। বর্তমানে দেশব্যাপী ৯৮টি উপজেলায় শান্তি প্রতিষ্ঠার এ কাজটি চলমান রয়েছে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬ এর শান্তি, ন্যায়বিচার এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
পিস অ্যাম্বাসেডর জাতীয় সম্মেলনে অতিথি হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত, এমপি, প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, আব্দুল আওয়াল মিন্টু, ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, মেজর (অব:) রানা মো: সোহেল, সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় পার্টি, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক সভাপিত বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট।
উপস্থিত প্রায় চারশত পিস অ্যাম্বাসেডরদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন সাইফুল ইসলাম বাদশা (রাজশাহী), অ্যাডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন (ময়মনসিংহ), আলহাজ্ব মকবুল হোসেন (পবা, রাজশাহী), হোসায়নুল মাতবর (কক্সবাজার), শাহিদা আখতার (বাগেরহাট), নাসিমা কামাল (ঝালকাঠি), মো. সিরাজুল ইসলাম (মেহেরপুর) প্রমুখ।
সকাল ১০.০০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সম্মেলনের কার্যক্রম। এরপর সারাদেশে পিএফজির কার্যক্রম নিয়ে নির্মিত একটি বিশেষ তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, আমি মনে করি, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তথ্যের সঠিকতা থাকা দরকার। সত্য নিরপেক্ষ হয় না। কিন্তু সত্যকে স্বীকার করতে হয়, সত্যকে মেনে নিতে হয়।
তিনি বলেন, অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কারণে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বিরাজ করছে। কিন্তু রাজনৈতিক মত-পার্থক্য থাকলেও আমাদের মধ্যে যদি আমরা ইতিবাচক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে যুক্ত হওয়া যাবে না।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমার পক্ষ থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিএফজির কার্যক্রমের ব্যাপারে আমার সমর্থন অব্যাহত থাকবে। আমাদের প্রচেষ্টা দ্বন্দ্ব নিরসন করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
স্বাগত বক্তব্য প্রদানকালে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা অনেক ত্যাগের মাধ্যমে এদেশ স্বাধীন করে গেছেন। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো দেশটাকে নতুন করে গড়ে তোলা। আমাদের মধ্যে মত-পথের ভিন্নতা থাকলেও আমাদের সবার পরিচয় হলো আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমি মনে করি, সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় না থাকলে কোনো দেশ বেশিদূর এগোতে পারে না। আশার কথা হলো, উপজেলা পর্যায়ে পিএফজির সদস্যরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে কাজ করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে আচরণবিধি প্রণয়ন করেছেন। শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার লক্ষ্যে সরকারও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমি মনে করি, বিভিন্ন দলের মধ্যে আদর্শগত ও কর্মসূচিগত মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থাকা দরকার, যাতে আমরা সকলে মিলে এই দেশকে এগিয়ে নিতে পারি। আর আমাদের স্বার্থেই আমাদেরকে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়াল মিন্টু বলেন, পিএফজির মাধ্যমে সারাদেশে আপনারা যে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তা বাংলাদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি কাজ। আমি মনে করি, সমাজকে একতাবদ্ধ করতে হলে এক মঞ্চে আসতে হবে, আলাপ-আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
আব্দুল আওয়াল মিন্টু বলেন, বৈষম্য বজায় থাকলে সমাজ এগোতে পারে না। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে গেলে সমাজে বৈষম্য বাড়তে থাকে। আমি মনে করি, বর্তমানে রাজনৈতিক সংকটের চেয়েও অর্থনৈতিক সংকট বড় সংকট। এসব সংকটের উত্তরণ ঘটাতে হলে একটা নতুন সামাজিক চুক্তিতে উপনীত হতে হবে, আলাপ-আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, রাজনীতিতে সমতার পরিবেশ তৈরি হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক ক্ষমতা এক হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে এবং বৈষম্য কমবে না।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব:) রানা মো: সোহেল বলেন, সংসদ সদস্য থাকাবস্থায় পিএফজির বেশকিছু অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় আপনাদের কার্যক্রম ও সদিচ্ছা বেশ প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বিরাজ করছে। কিন্তু কেন এ দ্বন্দ্ব ও সংঘাত? আমি মনে করি, এর কারণ হলো বিরাজমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমতা না থাকা, তথ্যের সঠিকতা না থাকা। আমি মনে করি, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সম্ভব না হলেও অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সহাবস্থান, সহমর্মিতা ও আলোচনা-আলোচনা থাকা দরকার।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার বিকল্প নেই। আমি মনে করি, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ঐক্য দরকার। এ ধরনের ঐক্য আমরা গড়ে তুলেছিলাম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিএফজিগুলোর উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, এই কাজে আমার সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পিএফজির কার্যক্রমের একটি বিবরণ তুলে ধরেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ পরিচালিত স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্ক্যাপ (এসপিএল) প্রকল্পের সহ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক আল-আমীন মিয়া এবং ‘নাগরিক’ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জুনায়েদ ইকবাল।
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার দিলীপ কুমার সরকার, পিএফজি সদস্য খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু, পিএফজি সদস্য আঞ্জু আনোয়ারা ময়না, পিএফজি সদস্য অধ্যাপক আসাদ আলী, পিএফজি সদস্য অ্যাডভোকেট রিপা সিনহা।

