জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা সবাই দেশকে ভালোবাসি এবং সবাই মিলে আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে চাই।’ তিনি আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, সকাল ১০:৩০টায় রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত সিরডাপ মিলনায়তনে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট আয়োজিত ‘সম্প্রীতি সংলাপে’ উপরোক্ত মন্তব্য করেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি জাতি, ধর্ম, বর্ণ সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে আমরা শক্তিশালী হবো, কোনো অপপ্রচার চালিয়ে আমাদেরকে পিছিয়ে রাখা যাবে না।
তিনি বলেন, আমরা বর্তমানে রাষ্ট্র মেরামতের চেষ্টা করছি। যে নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে বিগত জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে আমাদের ছাত্র-জনতা নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিল। আমরা এখন নতুন বাংলাদেশের দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করেছি। এই পর্বে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে আমাদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটাতে হবে। আমি মনে করি, সংস্কার ও নির্বাচনের মধ্যে বিরোধ নেই। একটার সঙ্গে আরেকটা ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।’

সম্প্রীতি সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর ইন্টেরিম কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর পরিচালক মুহাম্মদ রফিক-উল ইসলাম, ড. চার্লস রীড (ডিরেক্টর, অপারেশন্স, এজন্টেস অফ চেঞ্জ প্রজেক্ট এবং পলিসি অ্যাডভাইজার, চার্চ অফ ইংল্যান্ড), তাহেরা জাবীন (সোশ্যাল ডেভেলেপমেন্ট অ্যাডভাইজার, ফরেন, কমনওয়েলথ এন্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও), ব্রিটিশ হাই কমিশন, ঢাকা), ড. শাহনাজ করিম (এজেন্টস অফ চেঞ্জ: এ বাংলাদেশ ফ্রিডম অফ রিলিজিওন অর বিলিফ লিডারশিপ ইনিশিয়েটিভ প্রোগ্রামের অ্যাডভাইজার) প্রমুখ। এছাড়া আটটি জেলা থেকে আগত বিভিন্ন ধর্মীয় নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং তরুণদের প্রতিনিধিবৃন্দ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ-এর সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শশাঙ্ক বরণ রায়।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাব্রতী সংস্থা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট আত্মনির্ভরশীল, সমৃদ্ধ, মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিগত তিন দশক ধরে সারা দেশে নানাবিধ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ইউকেএইডের সহযোগিতায় ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর আয়োজনে বাংলাদেশে সম্প্রীতির সুদীর্ঘ ঐতিহ্য বিস্তৃত করেত নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ: এ বাংলাদেশ ফ্রিডম অফ রিজিয়ন অর বিলিফ লিডারশিপ ইনিশিয়েটিভ’ কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। তারই অংশ হিসেবে দেশের আটটি জেলায় ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি সুরক্ষায় তরুণ স্বেচ্ছাব্রতীগের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কর্মসূচিসমূহে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ সহায়তা করছেন। উল্লেখিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আজ ঢাকায় উপরোক্ত ‘সম্প্রীতি সংলাপ’ অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে অংশ নিয়ে চার্লস রীড বলেন, ‘আজ থেকে পাঁচ বছর আগে যখন আমরা বাংলাদেশে এই কার্যক্রম শুরু করেছিলাম, তখন আমাদের ধারণা ছিল না যে আমরা কতদূর এগোতে পারব। এখন সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ন্যাশনাল ফোরাম গঠিত হয়েছে, যেখানে আমাদের প্রকল্পের আটটি অঞ্চল থেকে নেতৃবৃন্দকে যুক্ত করা হয়েছে। এখন সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় জেলা পর্যায়ে যেসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে তা দেখে সত্যিই আমরা অনুপ্রাণিত ও মুগ্ধ। আমি আশা করি, এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।’

প্রশান্ত ত্রিপুরা বলেন, ‘সমাজে নানান জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের বসবাস থাকে, বিভিন্ন অভিরুচির মানুষ থাকে, সমাজে নানা বৈচিত্র্য রয়েছে। যে সমাজ ও রাষ্ট্র এই বৈচিত্র্যকে সম্মান দেখিয়ে তা ধারণ করতে পারে সে সমাজ ও রাষ্ট্র সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে। এজন্য দরকার পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মিথষ্ক্রিয়া। আমি মনে করি, সম্প্রীতির প্রবণতা সহজাত, যা আমরা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখতে পাই। কিন্তু আমরা তা মাঝে মাঝে ভুলে যাই।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে এবং সে প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে। আমরা আশা করি, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে ওঠবে, যেখানে সবাই সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর পরিচালক মুহাম্মদ রফিক-উল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যেক ধর্মের মূল বাণী হলো সম্প্রীতি, শান্তি ও ভালোবাসা। বৌদ্ধ ধর্মের মমার্থ অনুযায়ী অহিংসার সমাজ গড়তে পারলে সমাজে সম্প্রীতি বজায় থাকবে, আর খ্রীষ্ট ধর্ম অনুযায়ী প্রেম ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারলে সমাজে হিংসা ও বিদ্বেষ থাকতে পারে না। আর ইসলাম ধর্মে আজানের মাধ্যমে কল্যাণময় সমাজ গঠনের আহ্বান জানানো হয়। আমাদের শিল্প-সাহিত্যেও সাম্য ও সম্প্রীতির কথা বলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম ধর্মে ভিন্ন ধর্মের মানুষ ও প্রতিবেশীদের অধিকার রক্ষার কথা বারবার ব্যক্ত করা হয়েছে। আমাদের সব ধর্মেই মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে। আমাদের উচিত হবে এসব কথা বেশি বেশি প্রচার করা, সম্প্রীতির বার্তা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া। আমি মনে করি, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও তরুণরা সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে সবার আগে পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যে।’
বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন-এর রিলিজিয়াস সেক্রেটারি স্বরূপানন্দ ভিক্ষু বলেন, ‘পারিবারিকভাবে বিশেষ করে শিশু-কিশোর মনে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। আর সংখ্যাগুরুদের দায়িত্ব হবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন এদেশে নিরাপদ থাকে এবং নিরাপদে ধর্ম চর্চা করতে পারে তা নিশ্চিত করা। সম্প্রীতির বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে সবার আগে আমাদের মন ও চিত্তকে উন্নত করতে হবে।’
জেসাস কল চার্চ অব বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান রেভারেন্ড ডেভিড বৈদ্য বলেন, ‘সুসম্পর্ক আমাদের পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের ভিত্তি। আমাদের মধ্যে ধর্ম পালনে ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের মধ্যে লিঙ্গ, জাতি ও বর্ণভেদে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয়। আমাদের মধ্যে স্নেহ, শ্রদ্ধা, ভাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে আমাদের মধ্যে কোনো হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।’
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতির যুগ্ম সম্পাদক বিমল চন্দ্র চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশিরা একই পরিবারের সন্তান। তাই আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়। সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আন্তঃধর্মীয় সভা আয়োজন করা যেতে পারে। আমি মনে করি, ধর্মীয় সভা নিজ নিজ ধর্মের মাহাত্ম তুলে ধরা উচিত, ধর্মবিদ্বেষ ছড়ানো উচিত নয়।’
আহমদিয়া মুসলিম জামাতের এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিরেক্টর আহমেদ তাবসির চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ হাজার বছর থেকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের সংবিধানেও সকল ধর্মের মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে অসহিষ্ণুতার কারণে আমাদের মধ্যে বিভেদ বাড়ছে। আমরা মনে করি, সংলাপ হতে পারে এই বিদ্বেষ কমানোর একটি বড় উপায়। গ্রামে-গঞ্জে সর্বস্তরে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে তরুণরা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। ধর্মীয় সহিংসতা রোধে সরকার ও প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সবার প্রতি ভালোবাসা, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়- এই বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।’

উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানের শেষভাগে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তরুণদের সফলতার গল্প নিয়ে প্রকাশিত ‘ঐকতান’ নামের একটি প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

