খুলনায় নারীনেত্রী সম্মেলন-২০১৭

নীতি-নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে নারীনেত্রীদের অঙ্গীকার গ্রহণ
নীতি-নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি তথা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বিগত তিন বছর খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে নিবিড়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলশ্রুতিতে সেখানে গড়ে উঠেছে একদল স্বেচ্ছাব্রতী নারীনেত্রী, যারা নিজেদের বিকশিত ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার পাশাপাশি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি, নারী নির্যাতন বন্ধ করা এবং নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা-সহ বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন।

৩১ অক্টোবর ২০১৭, খুলনা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘বিকশিত নারীনেত্রীদের সম্মেলন-২০১৭’। ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর আয়োজনে ও ‘পলিটিক্যাল পারটিসিপেশন অব ইউমেন ফর ইকুয়াল রাইটস্’ (POWER) এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত উক্ত সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, আনবে দেশে উন্নয়ন’।

সম্মেলনে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ নারীনেত্রী-সহ খুলনা জেলা বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৫২০ জন নারীনেত্রী উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজ নিজ এলাকায় নারীদের জীবনমানের উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের সফলতাসমূহ উদ্যাপন করেন এবং সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। একইসঙ্গে তারা ভবিষ্যত কর্মকৌশল নির্ধারণ করেন

নারীনেত্রীদের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত উক্ত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ জাফর ইমাম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী বাবু নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার। এছাড়া অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খান আলী মনছুর, মহিলা পরিষদের জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট রসু আক্তার, নেদারল্যান্ড ও ভারত থেকে আগত দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর চারজন বিদেশি অতিথি এবং ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দ।

জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনের যাত্রা শুরু হয়। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মাসুদুর রহমান রঞ্জু-এর শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর বিশ্ব মঙ্গল কামনা ও নারীদের আলোর পথে আহবান করে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয়। এরপর অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয় এবং ডুমুরিয়া উপজেলায় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট পরিচালিত কার্যক্রমের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, ‘ডুমুরিয়া একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল, আমার জন্ম ও বাসস্থান। নিজের এবং সমাজের পরিবর্তনে আমাদের কাজ ও উৎসাহ দেখে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রধানও নারী। কিন্তু এটা আসলে নারীর অবস্থানের উন্নতি প্রমাণ করে না। নারীর অবস্থা ও অবস্থানের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সকল নারীর অবস্থা ও অবস্থানের উন্নয়ন। আর এ অধিকার অর্জনে নারীদেরকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নারীকে অধিকার অর্জন করতে গেলে প্রথমত নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে, নারী হিসেবে নয়। আমাদের সমাজের অর্ধেক অংশই নারী, বাকি অর্ধেক পুরুষ। তাই পুরুষদের এটি মানতে হবে যে, কাউকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব হবে না এবং নারীদের প্রতি তাদের আরও বেশি উদার হতে হবে এবং তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।’

উপস্থিত নারীনেত্রীদের উদ্দেশ্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমি আপনাদের অনুপ্রেরণামূলক কার্যক্রমের বিবরণ শুনে অভিভূত, উৎসাহিত ও ক্ষমতায়িত হয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, আপনাদের নেতৃত্ব ও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা এসডিজি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।’

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ডুমুরিয়া অঞ্চলের দশজন নারীনেত্রী দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর প্রশিক্ষণ তাদের চিন্তা-চেতনায় ও জীবনমানে কী পরিবর্তন এনেছে, তারা কীভাবে আয় বৃদ্ধিমূলক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাজে যুক্ত হলেন এবং বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে কীভাবে তারা স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন তা তুলে ধরেন।
নারীনেত্রী আকলিমা খাতুন বলেন, ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে আমি আত্মবিশ্বাসী হই যে, আমিও কিছু করতে পারবো। তারপর আমি সার ও কীটনাশকের একটি দোকান দেই। এখন আমার দোকানের মূলধন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। আমার পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নিতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। বর্তমানে আমি ২৫ জন নারীকে সংগঠিত করে জৈব সার প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছি।’

নারীনেত্রী শিক্ষা বসাক বলেন, ‘আগে সংসার জীবনের চার দেয়ালের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল আমার জীবন। আর দশজন নারীর মত আমার জীবনও চার দেয়ালের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর সমাজে নানা ধরনের কাজের মাধ্যমে আমার পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। আমি ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত সদস্য পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি এবং নির্বাচিত হই। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সামাজিক সমস্যা দূরীকরণে এখন আমি আরও বেশি শক্তিশালী ও সক্রিয়।’

ইয়ুথ লিডার তন্বী বলেন, ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর সাথে মাত্র দুইমাসের যাত্রা আমরা লক্ষ্যকে আরও বড় করে তুলেছে। আমি এখন নিজেকে ভীষণ শক্তিশালী অনুভব করি, কারণ এখন আর আমি একা নই। আমরা রক্তের গ্রুপিং ক্যাম্পেইন করে আমাদের কলেজের প্রায় সকল শিক্ষক ও ছাত্রীদের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করতে পেরেছি। এ সাফল্য আমার মত অনেককে নেতৃত্ব প্রদানে উৎসাহিত করেছে।’

নারীনেত্রীদের বক্তব্যের পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ তাদের অনুভূতি ও সাফল্যের কথা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে নীতি-নির্ধারণে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার গ্রহণ করে উপস্থিত নারীনেত্রীগণ একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। সবশেষে র‌্যাফেল ড্র ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে এক আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় নারীনেত্রী সম্মেলন-২০১৭।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.