‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রশিক্ষণ বদলে দিয়েছে তাসমিয়ার জীবন

আমাদের সমাজ অনেকটাই পুরুষশাসিত। এখানে নারীর পক্ষে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর সাফল্যের সাক্ষাৎ পাওয়া অনেক কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও কেউ না কেউ তা সম্ভব করে তোলেন এবং হয়ে উঠেন অনেকের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এমনই একজন আত্মপ্রত্যয়ী নারী বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলা চাঁদপাশা ইউনিয়নের বকশিরচর গ্রামের নারীনেত্রী তাসমিয়া। যিনি সবার কাছে তাসমিয়া আপা নামেই বেশি পরিচিত।

তাসমিয়ার জন্ম ১৯৮৩ সালের ২৫ অক্টোবরে, খুলনা জেলার বৈকালী এলাকায়। পিতার নাম মো. আতিয়ার খান আর মাতার নাম জরিনা বেগম। লেখাপড়ার ব্যাপারে আগ্রহ থাকলেও বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি তাসমিয়া। ২০০০ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী থাকাবস্থায় তার বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী একটি সংস্থায় সামান্য বেতনে চাকরি করেন। বিয়ের পরে শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে স্বামীর সংসারে ভালই দিন কাটছিল তাসমিয়ার। কিন্তু শ্বশুরের সংসার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়। স্বামীর সামান্য বেতন দিয়ে সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হিমসিম খেতে হয় তাদের। এ সময় তাসমিয়া সংসার পরিচালনার দায়ভার অনেকটা নিজে কাঁধে তুলে নিতে চাইলেও তা হয়ে উঠে না। কারণ পরিবারে তার কথার কোনো গুরুত্ব¡ ছিল না। এমনকি পরিবারের কোনো গুরুত্বপূর্র্ণ সিদ্ধান্তেও তাকে সম্পৃক্ত করা হত না।

২০১২ সালে তিনি সেভ দ্যা চিলড্রেন-এর একজন ইউনিয়ন কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এসময় কাজ করতে গিয়ে তাকে পরিবার ও সমাজের অনেক বাধা ও ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়। তখনও তিনি তার অধিকারের ক্ষেত্রে খুব একটা প্রতিবাদ করতে পারতেন না বা সোচ্চার ছিলেন না।

২০১৩ সালে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহানাজ পারভীন রাণী-এর মাধ্যমে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ শীর্ষক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের কথা জানতে পারেন। রাণীর আমন্ত্রণে তিনি উক্ত প্রশিক্ষণে (১১৯তম ব্যাচ) অংশগ্রহণ করেন। তিন দিনের এই প্রশিক্ষণে তাসমিয়া জেন্ডার বৈষম্য, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের উপায়, নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা-সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জানতে পারেন, যা তার জ্ঞানের পরিধি ও আত্মশক্তি বাড়িয়ে দেয়। তার জীবন বদলের মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে এই প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণের পর তিনি তার দুটি লক্ষ্যকে স্থির করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। একটি হলো তার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনয়ন, আরেকটি হলো সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সমাজ ও সমাজের মানুষের কল্যাণে কাজ করা।

তাসমিয়া ২০১৪ সালে প্রথমে একটি পুকুর লিজ নেন এবং এতে মাছ চাষ শুরু করেন। এতে তার ভাল আয় হয়। আয় ভাল হওয়ায় পরের বছর আরও একটি পুকুর লিজ নেন। তার এই কার্যক্রম দেখে গ্রামের অনেক নারীই অনুপ্রাণিত। তাছাড়াও তিনি গ্রামের নারীদের নিয়ে ‘বকশিরচর আশার আলো গণগবেষণা’ সমিতি নামে একটি সমিতি গড়ে তুলেছেন। এই সমিতির সঞ্চয় থেকে সমিতির সদস্যদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয়।

তাসমিয়া তার এলাকার গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। বিশেষ করে শিশুর টিকাদান এবং শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো-সহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন তিনি।

তাসমিয়া নিজে উচ্চশিক্ষিত না হলেও দক্ষতা, মেধা ও সাহসিকতার ফলে তিনি এখন শুধু নিজ গ্রাম বা ইউনিয়নেই নয় অন্য ইউনিয়ন ও উপজেলাতেও সমিতি, সংগঠন ও নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সন্তানদেরও শিক্ষিত করে তুলছেন তিনি। তার দু সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে ২০১৬ সালের এসএসসি পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে বরিশাল পলিটেকনিক কলেজে অধ্যায়নরত, আর ছোট ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ছে।

তাসমিয়া তার বদলে যাওয়া সম্পর্কে বলেন, ‘আমার সফল হওয়ার পেছনে অনেকটাই দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর অবদান। কারণ আমি ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রশিক্ষণ না পেলে হয়তো আজ আমি যে অবস্থানে পৌঁছেছি সেখানে হয়তো আসতে পারতাম না।’

তবে তাসমিয়া তার কাজে পরিতৃপ্ত নন। তিনি আজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে চান। তিনি মনে করেন, প্রত্যেকটি মানুষেরই রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা। সবাই যদি সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধে উজ্জীবিত হয় তাহলে সমাজ অনেক এগিয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.