ব্র্যাক ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর যৌথ উদ্যোগে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজির স্থানীয়করণ’ বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

Roundtable discussion on “Localising SDGs”শুধুমাত্র জাতিসংঘ, সরকার কিংবা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের পক্ষে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি’র লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব নয়। এগুলো অর্জিত হতে হবে মূলত স্থানীয় জনগণ, স্থানীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে। এজন্য এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এর স্থানীয়করণ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞগণ। আজ ২১ ডিসেম্বর ২০১৫, সকাল ১০.০০টায় ‘ব্র্যাক সেন্টার ইন’ ঢাকায় ব্র্যাক কমিউনিটি অ্যামপাওয়ারমেন্ট প্রোগ্রাম ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর যৌথ উদ্যোগে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজির স্থানীয়করণ’ বিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে তাঁরা এ মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জনাব ড. আকবর আলী খান। অতিথি আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ওয়াটকিনস, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার, ব্র্যাক কমিউনিটি অ্যামপাওয়ারমেন্ট প্রোগ্রাম-এর পরিচালক আন্না মিন্জ, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ-এর উপ-পরিচালক জনাব নাছিমা আক্তার জলি এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব রাশেদা আখতার প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্র/সরকার প্রধানেরা ‘এসডিজি’ অনুমোদন করে। এসডিজিতে বিস্তারিত, সুদূরপ্রসারী ও গণকেন্দ্রিক, বিশ্বজনীন  রূপান্তর সৃষ্টিকারী ১৭টি লক্ষ্য এবং ১৬৯টি টার্গেট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

এসডিজি’র বিশেষত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এসডিজি সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে, যদিও এমডিজি প্রণয়ন করেছিল একদল বিশেষজ্ঞ। বস্তুত এটি ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য ও জনগণের এজেন্ডা’ এবং এর বাস্তবায়নও নির্ভর করবে মূলত জনগণের ওপর। যদিও নতুন এজেন্ডা এমডিজির অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণীত, কিন্তু এটির গুরুত্ব হলো যে, এটির পরিধি এমডিজি থেকে অনেক বিস্তৃত এবং এমডিজির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এর লক্ষ্য। দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিসহ উন্নয়নের গতানুগতিক কর্মসূচির বাইরেও এটিকে আরও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ সংক্রান্ত লক্ষ্য নিয়ে। আমরা মনে করি, শুধু শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতির ওপর প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে না, এর জন্য আরো প্রয়োজন হবে শান্তি প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র গঠন, মানবাধিকার বাস্তবায়ন ও সুশাসন কায়েম করার মতো ইস্যুগুলোর প্রতি মনোনিবেশ। এর জন্য প্রয়োজন একধরনের হলিস্টিক, উর্ধ্বমুখী ও সু-সংহত ‘কমিউনিটি-লেড ডেভেলপমেন্ট’ এপ্রোচ, যার উদ্দেশ্য হবে পুরো সমাজের পরিবর্তন, এর অনুন্নয়নের আংশিক প্রতিকার নয়। এর জন্য প্রয়োজন হবে সমাজে নারী, পুরুষ ও তরুণদের তাদের জীবনের হাল ধরার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই প্রক্রিয়ার জন্য আরও প্রয়োজন হবে নাগরিকদের পরিবর্তনের রূপকার হিসেবে সক্রিয়করণ এবং অনুঘটকের ভূমিকা পালনকারী একটি কার্যকর ও দায়বদ্ধ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা।’
untitled
ড. বদিউল আলম মজুমদার এসডিজি’র বাস্তবায়নে কতগুলো করণীয় তুলে ধরে বলেন, ‘ক) সরকারকে আন্তরিক এবং প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হতে হবে, বিশেষত এসডিজির ১৬তম লক্ষ্য বাস্তবায়নে। সমাজের সকল স্তরে স্বচ্ছ, কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক। (খ) নীতিতে পরিবর্তন এনে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তথা ইউনিয়ন পরিষদকে যথাযথ দায়-দায়িত্ব, সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। (গ)  ইউনিয়ন পরিষদ যাতে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ অনুযায়ী জনঅংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সে জন্য পরিষদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। (ঘ) পরিষদের কাজকে সহায়তা করতে পারে, সাধারন মানুষের কাজকে উৎসাহিত করতে পারে সর্বোপরি তৃণমূলে ওয়াচ ডগ বডি হিসেবে কাজ করতে পারে এমন সিভিল সোসাইটি গড়ে তুলতে বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। (ঙ) অর্র্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনে একটি সমন্বিত কর্মসূচি প্রয়োজন। (চ) অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাত এর যথাযথ ভূমিকা পালন প্রয়োজন (ছ) জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথাযথ এবং সময়োপযোগী সহযোগিতা প্রয়োজন (জ) সকল স্তরে পরিবীক্ষণ এবং তা শুরু হবে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে।’

ড. আকবর আলী খান বলেন, ‘বাংলাদেশ এমডিজি (জাতিসংঘের সহাস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জন বিশেষ করে দারিদ্র্য দূরীকরণে উল্লেখযোগ অগ্রগতি সাধন করেছে। কিন্তু মানব উন্নয়নের সব সূচকে আমরা সেভাবে উন্নয়ন করতে পারিনি। বিশেষ করে অপুষ্টি রোধ এবং নিরাপদ পানি সরবরাহে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।’ তিনি তাঁর বক্তব্যে ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এসডিজির লক্ষ্য তিনটি পর্যায়ে যথা বৈশ্বিক, জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে অর্জন করতে হবে বলে মত দেন।

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ নয়, এটি একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। ছোট প্রতিষ্ঠান হলেও এর কার্যক্রম ও দায়িত্ব অনেক। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয় সরকার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে উপদেষ্টা করে রেখে উপজেলা পরিষদকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় এলিটরা স্থানীয় সরকারের ওপর খবরদারিত্ব করে থাকেন। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজকে ওয়াচ ডগের ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়া স্থানীয় সরকারকে তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পেশ করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এবং নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্যতম বাধা বাল্যবিবাহ রোধ করতে হবে।’

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এমডিজি অর্জনে ভালো করলেও আমরা এর সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। তাই এমডিজির বাস্তবতাকে সামনে রেখে পরিকল্পনা নিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। যে পরিকল্পনা হবে জনঅংশগ্রহণমূলক। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার থেকে চাপিয়ে দেয়া কোনো পরিকল্পনা তথা একপেশে পরিকল্পনা দিয়ে কোনো লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। এছাড়া শুধুমাত্র স্থানীয় সম্পদের ওপর নির্ভর না বৈদেশিক সম্পদ আহরণের ওপর নজর দিতে হবে এবং দেশের সব অঞ্চলের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।’

জনাব রবার্ট ওয়াটকিনস বলেন, ‘এমডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এখন এসডিজি অর্জনে বৈশ্বিক পরিকল্পনার পাশাপাশি জাতীয়ভাবে তথা স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দরকার হবে। বাংলাদেশে মাত্র এক শতাংশ মানুষ কর প্রদান করে। এ সংখ্যা বাড়ানো দরকার। এসডিজি অর্জনে স্থানীয় সরকার বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাই এসডিজি সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। সুশীল সমাজকে এসডিজি বাস্তবায়নে ওয়াচ ডগের ভূমিকা পালন এবং কখনো কখনো তাদের পরিকল্পনা প্রণয়নেও ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়া সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এডডিজি বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত করতে হবে।’

জনাব আন্না মিন্জ বলেন, ‘এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করতে পেরেছি। এখন এসডিজি’র লক্ষ্য কীভাবে অর্জিত হবে সে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। আমি মনে করি, এটি বাস্তবায়ন করতে হবে স্থানীয় পরিকল্পনায় এবং স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে। এছাড়া ইতোমধ্যে যেসব কৌশল প্রয়োগ করে আমরা এমডিজি অর্জন করতে পেরেছি, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।’

জনাব নাছিমা আক্তার জলি, ‘যে কোনো লক্ষ্য অর্জনে সরকারের দায়বদ্ধতার পাশাপাশি জনগণের দায়িত্ব রয়েছে। প্রান্তিক অনেক জনগণই এমডিজি ও এসডিজি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে না। তাই এসডিজি অর্জন করতে হলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, তাদের তথ্য দিয়ে সচেতন ও সক্রিয় করে তুলতে হবে। আমি মনে করি, জনগণকে সক্রিয়করণের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদকে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

জনাব রাশেদা আখতার বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে সম্পদ ও জনবল বাড়াতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মনিটরিং ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার। এছাড়া স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ কমিশন গঠন করা দরকার। স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নতুন নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা দরকার।’

বাগেরহাটের বেতাগা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব স্বপন দাশ বলেন, ‘এমডিজি অর্জনে আমরা ইউপি পরিষদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছি। ইউনিয়ন পরিষদকে কার্যকর করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, নলকূপ স্থাপন, শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তিকরণ এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে আমরা সক্রিয় রয়েছি। আমরা পরিষদের উদ্যোগে ফান্ড গঠন করে স্যাটিটেশন সমস্যার সমাধান করেছি, ১০০ একর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছি এবং বিভিন্ন সমিতির মাধ্যমে পুরো ইউনিয়নে ৬০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। ছাত্রদের বৃত্তি দেয়া হচ্ছে বাৎসরিক ৬০ হাজার টাকা।তবে বাল্যবিবাহ রোধে আমরা উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করতে পারেনি। ’ তিনি বলেন, ‘এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসঙ্গে মনিটরিং বাড়াতে হবে।’

গোলটেবিল বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.