দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর উদ্যোগে ‘সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

Social Harmony Round table (2)

বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নাগরিকের ও রাষ্ট্রের করণীয় নির্ধারণ করতে আজ ২৮ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে ‘দি ডেইলি স্টার সেন্টারে’ একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’ ও ‘দি ডাইভারসিটি সেন্টারে’র যৌথ উদ্যোগে ‌‌’সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে অতিথি আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব ড. আকবর আলী খান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব এ ওয়াই বি সিদ্দিকী, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, ইয়াং গ্লোবাল লিডার ও বিশিষ্ট ব্যাংকার লুৎফে সিদ্দিকী, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ড. হামিদা হোসেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইবরাহিম, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত উবিনীগ-এর নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়–য়া প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সৈকত শুভ্র আইচ মনন।

সৈকত শুভ্র আইচ মনন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, ‘সকল যুগে, সকল সমাজেই বহুবিচিত্র মানবগোষ্ঠী পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-লিঙ্গ-ভাষার বিভিন্নতায় পরিচয়ের এই বৈচিত্র্যই মানব সমাজের সহজাত চিত্র। এইসব বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিচয়ের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সহযোগিতা, মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই একটি সমাজের ফুহধসরপং গড়ে ওঠে। যে সমাজ বা রাষ্ট্র তার প্রাধান্য বিস্তারকারী গোষ্ঠীর সমান্তরালে অন্যান্য দূর্বলতর গোষ্ঠীর সকল নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মালিকানা নিশ্চিত করে এই ফুহধসরপং-কে সুস্থ ধারায় পরিচালিত করতে পারে, সে সমাজ বা রাষ্ট্র বিকশিত হয়। অন্যথায় তা ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়, কখনও বা ভেঙে পড়ে। সমাজ বিজ্ঞানীরা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের গোড়ার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে প্রধানত দায়ী করে থাকেন। কিন্তু সম্প্রীতিহীনতা সাধারণত প্রকাশ পায় ‘আইডেন্টিটিবেজড প্রিজুডিস’ বা ‘পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষাত্মক মনোভাবে’। এই পরিচয়ভিত্তিক প্রিজুডিস বা সংস্কার নিজেও একটি স্বাধীন স্বত্ত্বা যা দৃশ্যমানভাবেই বৈষম্যকে প্রতিপালন করে। ‘পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষ’গড়ে ওঠে মানুষের জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-লিঙ্গ-ভাষার বিভিন্নতাকে কেন্দ্র করে। রাজনৈতিক পরিচয়ও এই বিদ্বেষের ভিত্তি হতে পারে, তবে এটি জাতি-ধর্ম বা ভাষার মতো স্থায়ী কোনও প্রপঞ্চ নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা হর-হামেশাই পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষকে উস্কে দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও দেখা গেছে যে, সহিংসতার সাধারণ এবং সহজ শিকার হচ্ছে নারী এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবাদমান কোনো পক্ষভুক্ত নয়।’

প্রবন্ধের শেষভাগে তিনি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কতগুলো করণীয় তুলে ধরেন, ১. ‘অল্টারনেটিভন্যারেটিভ’ দাঁড় করানো: চরমপন্থা বা র‌্যাডিক্যালাইজেশন প্রতিরোধে ‘কাউন্টারন্যারেটিভের’ ধারণা বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু কাউন্টার ন্যারেটিভের কিছু ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, কাউন্টার ন্যারেটিভ আত্মপক্ষ সমর্থনের অপশন তৈরি করে। যার ফলে যুক্তিতে পরাজিত করা গেলেও ব্যক্তিকে তার অবস্থান পরিবর্তন করানো যায় না, বরং আহত ইগো নিয়ে সে তার পূর্বতন অবস্থানকেই সবলে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, কাউন্টার ন্যারেটিভ বিকল্প কোনো কর্মসূচি প্রস্তাব করে না, যার ফলে ব্যক্তি সক্রিয় হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। সে বিবেচনায় ‘অল্টারনেটিভ ন্যারেটিভ’-এর কার্যকারিতা অধিক। কারণ এই ন্যারেটিভ ব্যক্তির সাথে প্রত্যক্ষ কনফ্রন্টেশনে যায় না, বরং তার সামনে বিকল্প প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে, যেখানে তার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অল্টারনেটিভ ন্যারেটিভের কেন্দ্রে থাকতে পারে স্বদেশ চিন্তা এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন। যা তার সংহতির ধারণাকে বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয় থেকে মুক্ত করে স্বদেশকেন্দ্রিক ও গণমুখী করতে পারে। ২. বৈচিত্র্য উদ্যাপন: বৈচিত্র্য সম্পর্কে ভীতিও সন্দেহের ধারণা দূর করতে বৈচিত্র্যের সাথে ব্যক্তির যোগাযোগহীনতার অবসান ঘটানো জরুরি। সমাজকে সংস্কারবদ্ধতা বা প্রিজুডিস মুক্ত করার এটিই প্রত্যক্ষ উপায়। ভিন্ন সংস্কৃতিসমূহের মধ্যে বিনিময়ের সুযোগ সৃজনশীল উপায়ে বাড়াতে হবে। অপরিচয়ের আড়াল যে মুখাবয়বকে শত্র“ বলে গণ্য করায়, তাকে প্রত্যক্ষে এনে দিলে মানুষতার সাথে নিজের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়ে আশ্বস্তহয়। ৩. নিপীড়িতের প্রতিরোধ সামর্থ্য গড়ে তোলা: বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রবণতার কোনও দৃষ্টান্ত সচরাচর খুঁজে পাওয়া যায় না। এই প্রতিরোধ সামর্থ্য বা ইচ্ছার অভাবতাকে পলায়নপর করে তুলেছে, যা তার মর্যাদার আরও অবনমনের জন্যে দায়ী। এই পরিস্থিতি তাকে আরও ‘অপর’ করে তুলে প্রবল প্রতিপক্ষের সাথে কোনো ডায়ালগ বা সামাজিক চুক্তির সম্ভাবনাকে ক্ষীণতর করে দেয়। সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তাই নিপীড়িত গোষ্ঠীও সম্প্রদায়সমূহের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তাদের প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ৪. একদল ‘চ্যাম্পিয়ন’ তৈরি করা: এটি সর্বশেষ, কিন্তু নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয়। কারণ উপরের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের জন্যেই একদল শুভবোধসম্পন্ন, নিবেদিত মানুষ দরকার। সমাজে প্রভাব বিস্তারের সামর্থ্য রয়েছে এমনকিছু মানুষকে এই কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করা দরকার, যারা সম্প্রীতি বিনষ্টের ন্যূনতম আশঙ্কা দেখামাত্র সেখানে হস্তক্ষেপ করবে, সমাজে ভেদাভেদের উর্দ্ধে সম্প্রীতিকে ঠাঁই দেবে, এবং মানুষকে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতায়িত করবে।একটি বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে তোলার তাগিদে রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্যে প্রবল জনমত তৈরির কাজটিও এরাই করতে পারে।

ড. আকবর আলী খান বলেন, ‘বাংলাদেশে বিভিন্ন সাংঘর্ষিক শক্তি কাজ করছে। তাই যে কোনো সময় সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় সামাজিক পুঁজি গড়তে না পারলে আমাদের সম্প্রীতি ও উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে। সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে একে অপরের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে অভদ্র ও অসৌজন্যমূলক ভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার কাজটি কঠিন হলেও এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’

আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা হয়। তাই যারা সম্প্রীতি নষ্ট করে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। আর সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং স্থানীয়ভাবে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘একটি সমাজের ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ বসবাস করে। এ ভিন্নতাই আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করে। এই ভিন্নতাকে কাজে লাগিয়ে আবার কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ দ্বন্ধ ও সংঘর্ষ তৈরি করে। এ অবস্থায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এবং সামাজিক পুঁজি কাজে লাগিয়ে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে হবে।’

লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ‘সামাজিক সম্প্রীতি ও অগ্রগতিতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদেরও সচেষ্ট হতে হবে। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাগুলোই মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে ভূমিকা পালন করবে। একইসঙ্গে সফলতার উদাহরণগুলোকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হয়।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানানো ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু পরবর্তীতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী তথা প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমস্বরে আওয়াজ তুলতে হবে।’

অ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত বলেন, ‘ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা ও গণতন্ত্রকে সমুন্বত রাখার জন্য সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা দরকার। আমরা সাম্য, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর পরও ধর্মতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা একইসঙ্গে চলছে।’ তিনি বলেন, ‘সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার পেছনে কারা দায়ী তা চিহ্নিত করা এবং নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দলগুলোকে ভূমিকা পালন করতে হবে।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ‘বাংলাদেশে অতীতে কোনোকালেই সামাজিক সম্প্রীতির অভাব ছিল না। কিন্তু ক্ষমতা ও স্বার্থ হাসিলের জন্য এ অভাব সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্তমানে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানবাধিকার ও বাক্ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’

ড. হামিদা হোসেন বলেন, ‘গণতন্ত্র মানেই আলাপ-আলোচনা। এর মাধ্যমেই সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা হতে পারে। এজন্য রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমানে তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ করে দলিতরা স্কুলে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন অধিকার আদায় করছে।’

ফরিদা আখতার বলেন, ‘ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং নাগরিক হিসেবে আমাদের পরিচয়ই সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক সম্প্রীতি নষ্টে যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত না করে পূর্ব ধারণা থেকেই অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এটা ভীতিকর।’

ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক  ও রাজনৈতিক কারণে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তাই ক্ষতকে কাটিয়ে ওঠার জন্য সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা দরকার।’ কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার প্রসঙ্গে বলেন, ‘রামুর ঘটনায় ৩৮৫ জনকে অভিযুক্ত করে ১৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই নিরপরাধ। তাই সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে বিচারিক সমতাও বজায় রাখা দরকার। রাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।’