সফলতার গল্প: মানবাধিকার পুরস্কার বিজয়ী জাহানারা বেগম-এর গল্প

Jahanara Begum story (9)“দি হাঙ্গার প্রজেক্ট হতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গোপন মন্ত্র আমি শিখেছি। এখন আমি আমার অন্তর্নিহিত শক্তি অনুধাবন করতে পারি, যেটি আমাকে মানবাধিকার চ্যাম্পিপয়ন পুরস্কার এনে দিয়েছে।’ – কথাগুলো যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের ৩৫ বৎসর বয়সী নারীনেত্রী জাহানারা বেগমের।

তার এ কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একসময় তাকে বিভিন্ন কারণে, এমনকি নিকটজনের কাছ থেকেও অনেক দুঃখ পেতে হয়েছে। বিদ্যালয়ে ভাল ফলাফল (পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি) করা সত্ত্বেও ইভটিজিং-এর হাত হতে রক্ষা করার জন্য মা-বাবা অল্প বয়সে তার বিয়ে দিয়ে দেন। বিবাহ মানুষের জীবনে আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করলেও তা হয়নি জাহানারার জীবনে। তার পরিবার যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নিকট প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে। এমনকি বিয়ের প্রথম এক বছর স্বামীর সাথে সংসার করারও সুযোগ পাননি জাহানারা। এক বছর পরই তিনি তার স্বামীর সাক্ষাৎ পান এবং ভাল কিছুর আশায় ঢাকার উদ্দেশ্যে গ্রাম ত্যাগ করেন। এরপর তাদের জীবন ভালই কাটছিল।

দু বছর পর গ্রামে ফিরে এসে স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন জাহানারা। তিনি ২০১২ সালে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক আয়োজিত (৯২তম ব্যাচ) ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি জানান, ‘প্রশিক্ষণটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আমি সমাজে নারীদের অবস্থা ও অবস্থান, নারী  নির্যাতনের কারণ এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে ধারণা পাই।’

শিক্ষকতার পাশাপাশি জাহানারা নিজেকে সামাজিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করেন এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি। ইতোমধ্যে তিনি যৌতুক দিয়ে সম্পন্ন হতে যাওয়া ২১টি বিবাহ বন্ধ করেছেন। গ্রামীণ নারীদের সচেতন করে তোলার জন্য যৌন হয়রানি বিষয়ক ছয়টি, স্কুল হতে ঝড়ে পড়া বিষয়ক আটটি, পুষ্টি বিষয়ক  দশটি এবং গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ক ১২টি উঠান বৈঠক পরিচালনা করেছেন। স্থানীয় লোকজনকে সাথে নিয়ে ২০ জন বালিকাকে শিশুবিবাহের অভিশাপ হতে রক্ষা করেছেন, যাদের প্রায় সবাই বর্তমানে লেখাপড়া করছেন।

জাহানারা ২০১৩ সালে সেলাই প্রশিক্ষণের গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ পরবর্তী সময়ে তিনি ১৫ জন নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যারা বর্তমানে এ কাজ করে নিজেদের আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। জাহানার নিজেও কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে প্রতিমাসে তিন হাজার টাকা উপার্জন করেন।

জাহানারা দশজন গ্রামীণ নারীকে নিয়ে ‘কুমারঘাটা মহিলা কৃষি ক্লাব’ গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে সঞ্চয় প্রায় ৪২ হাজার টাকা। সংগঠনের সদস্যরা স্বপ্ন দেখছেন একটি পোশাক শিল্প গড়ে তোলার, যার মাধ্যমে সকল নারী আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করবে। ৪১ জন ধাত্রী নিয়ে আরও একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন জাহানারা।

জাহানারা বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক, জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম, আইসিএম ক্লাব ও সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছেন। সামাজিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ কর্তৃক তিনি ‘মানবাধিকার চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার-২০১৫’ লাভ করেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান-এর হাত থেকে তিনি এ সম্মাননা পুরস্কার গ্রহণ করেন। এ পুরস্কার তথা সম্মাননা তথা সমাজ উন্নয়নে তার প্রত্যাশাকে আরও বৃদ্ধি করেছে। জাহানারা বেগম বিশ্বাস করেন, সবাই যদি নিজ অবস্থান থেকে সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখে- তবেই একদিন আমরা পাবো সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ।