আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার গ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন-২০১৪

NSP_3466নির্যাতন-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া, সর্বোপরি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত এবং  আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন-২০১৪। ১৩ নভেম্বর, ২০১৪ রাজধানী ঢাকার কাকরাইলে অবস্থিত ইন্সিটিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সারাদেশ থেকে আগত তৃণমূলের প্রায় দেড় হাজার নারীনেত্রী অংশগ্রহণ করেন। তারা নিজ নিজ এলাকায়, বিশেষ করে নারীদের জীবনমানের উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং এর মাধ্যমে যে সফলতা এসেছে তা উদ্যাপন, সংগ্রামের অভিজ্ঞতাগুলো বিনিময় এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যত কর্মকৌশল নির্ধারণ করেন এ সম্মেলনে।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি। NSP_3888অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওসা স্কোজস্ট্রোম ফেল্ট- প্রেসিডেন্ট ও সিইও, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট (গ্লোবাল), ড. সাঈদা হামিদ- সদস্য, গ্লোবাল বোর্ড, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট, ড. রওনক জাহান- সম্মানিত ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ড. গোলাম মুরশিদ- বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক, ড. বদিউল আলম মজুমদার- গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট, ড. হামিদা হোসেন- মানবাধিকার নেত্রী, ফরিদা পারভীন- বিশিষ্ট লালন সংগীত শিল্পী এবং ইফফাত আরা নার্গিস- মহাপরিচালক, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) প্রমুখ। এছাড়া দি হাঙ্গার প্রজেক্ট গ্লোবাল কার্যালয় (নিউইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) থেকে আগত আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ, সুজনÑসুশাসনের জন্য নাগরিক ও জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম-এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও নেতৃবৃন্দ এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিবৃন্দ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

সকাল ১০.০০টায় সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন শুরু হয় জাতীয় সংগীত ও ‘আমরা নারী, বিকশিত নারী’ (সংগঠনের থিম সং) গান পরিবেশনের মাধ্যমে। এরপর যে সকল সাহসী নারী সমাজ উন্নয়নে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়।

rasedaএ পর্বে সভাপতিত্ব করেন (উদ্বোধনী অধিবেশনে) বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি’র সভাপতি এবং চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রাশেদা আখ্তার। তিনি তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘নারীরা আজ জেগে উঠেছে। তারা নিজেরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি অবদান রাখছে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে। আজকে নারীদের ভূমিকার কারণে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা অনেকটাই দূরীভূত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আজকের সম্মেলন থেকে আমাদের শপথ নিতে হবে যে, আমরা নারীরা আর পিছিয়ে থাকবো না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।’

সংহতি অধিবেশন পর্বের শুরুতে গত সম্মেলনের পর থেকে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর যেসকল নারীনেত্রী মৃত্যুবরণ করেছেন এবং যারা এ সময় নিজ কীর্তি দিয়ে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে সকলে মিলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এর আগে তাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন ঝিনাইদহ অঞ্চলের নারীনেত্রী ফিরোজা বুলবুল কলি।

joly apaএরপর ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ কর্মসূচির দ্বি-বার্ষিক (জুলাই ২০১২-জুন ২০১৪) প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি। সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের শুরুতে তিনি বলেন, ‘স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “সকলকে গিয়া বলো- ওঠো, জাগো, আর ঘুমিও না, সকল অভাব দুঃখ ঘুচাবার শক্তি তোমাদের নিজের ভিতরে রয়েছে।” স্বামী বিবেকানন্দ-এর কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমিও বলতে চাই, বন্ধুগণ আপনারা যারা নানান ধরনের কষ্ট সহ্য করে সমগ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমাদের এ সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন, এজন্য আমি আমার পক্ষ থেকে এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে রক্তিম শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাই। একইসঙ্গে আমন্ত্রিত দেশি-বিদেশি অতিথিগণকেও জানাচ্ছি শুভেচ্ছা। আজ আমরা গর্বিত ও আনন্দিত এ কারণে যে, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের পর আমরা আজ আবার একত্রিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমি মনে করি, এটা বিকশিত নারীনেত্রীদের জন্য প্রাণের এবং ভালবাসার মিলনমেলা।’

তিনি বলেন, ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক তৃণমূলে নারীদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি প্রতিশ্রুতিশীল সংগঠন। তবে এটি কোনো নিবন্ধিত সংগঠন নয়। এটি দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর সার্বিক সহযোগিতায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং প্রশিক্ষণ পরবর্তী সময়ে তাদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। এর মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র নারীদের সংগঠিতই করা হয় না, যাতে করে তারা আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠতে পারে, তাদের উচ্চকিত কণ্ঠগুলো অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে, তাদের প্রতি যে বঞ্চনা ও নির্যাতন করা হয় তা প্রতিরোধ করতে পারে, তাদের চিন্তা-চেতনা, দাবি ও অধিকারগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে সেজন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়, যা নারী জাগরণের বৈশ্বিক চেতনার সঙ্গে একইসুরে মিলিত হবে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে আমাদের নারীনেত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২৩৬ জন, কিন্তু বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত সহস্রাধিক। এর মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয় যে, আমরা একত্রিত হতে পারি এবং আমাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আমরা একটি প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে পারি।’

এরপর তিনি নারীদের মধ্যে নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য যে চারটি ধাপ অনুসরণ করা হয় তা তুলে ধরার পাশাপাশি বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সাংগঠনিক কাঠামো, নারীনেত্রীদের জীবনে ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ কার্যক্রমের প্রভাব, জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা ও ক্ষুধামুক্তির আন্দোলনকে বেগবান করার গুরুত্ব, বিশেষ করে এমডিজি অর্জনে নারীনেত্রীদের ভূমিকা ও ফলাফল এবং নেটওয়ার্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জসমূহ রয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর শুরু হয় অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্ব। এ পর্বে দশজন নারীনেত্রী (দশ অঞ্চল থেকে একজন করে) তাদের নিজ অঞ্চলে বাস্তবায়িত নারীনেত্রীদের কাজের সফলতা তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

প্রথমেই খুলনা অঞ্চলের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা কমিটি’র সভাপতি লক্ষী সরকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলের সহস্রাধিক নারীনেত্রী নিজেরা সংগঠিত হয়ে ব্যাপক সফলতা অর্জন করে চলেছি। নারীনেত্রী হওয়ার কারণে আমি নিজে সামান্য একজন গৃহবধূ হয়েও উপজেলা পরিষদের (কোটালীপাড়া) ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পেরেছি। এছাড়া এ অঞ্চলের প্রায় তিন শ’ জন নারীনেত্রী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে বসে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। ইতোমধ্যে নারীনেত্রীদের প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলের পাঁচটি ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া যৌতুকমুক্ত বিবাহ সংঘটন ও হিন্দু নারীদের বিবাহ নিবন্ধন, শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানো, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ, গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা ও শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আমাদের নারীনেত্রীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’

ঝিনাইদহ অঞ্চলের পক্ষ থেকে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক যশোর জেলা কমিটি’র সদস্য দিপা মজুমদার বলেন, ‘আমার বয়স যখন দশ বছর তখন আমার বাবা যৌতুক দেয়ার ভয়ে আমাকে বিয়ে দিয়ে দেন। যৌতুকহীন বিয়ের কারণে আমাকে সৎ শাশুড়ির সংসারে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। ১৯৯৯ সালে আমার স্বামী মৃত্যুবরণ করলে আমার জীবনে নেমে আসে কালোরাত্রি। কিন্তু আমি ভেঙ্গে পড়িনি। আমি সিদ্ধান্ত নেই যে, আমি নিজে বাঁচবো, আমার আশেপাশের নারীদেরও সহযোগিতা করবো। এ স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় ‘অঙ্কুর মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’র জন্ম। এর আগে আমি দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর উজ্জীবক প্রশিক্ষণে এবং ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণ করি। এরপর থেকে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সাথে যুক্ত হয়ে শিশু শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি উন্নয়ন এবং নারী পাচার রোধ ইত্যাদি সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ করে আসছি। পাশাপাশি আমি আমার সন্তানদেরও ভালভাবে লালন-পালন করছি। আমি মনে করি, এ সফলতার মূলে ছিল আমার আত্মশক্তি। আর এ আত্মশক্তি আমি পেয়েছি দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর প্রশিক্ষণ থেকে। নারীনেত্রী হিসেবে আমার কাজের বাইরেও ‘অঙ্কুর মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’য় যারা হস্তশিল্পের কাজ করে তাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করি।’

রংপুর অঞ্চলের পক্ষ থেকে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক রংপুর জেলা কমিটি’র আহ্বায়ক ইরা হক বলেন, ‘আমি দু বার রংপুর পৌরসভার নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলাম। আর কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার জন্য আমি উৎসাহ পেয়েছি ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ ফাউন্ডেশন কোর্স থেকে। কাউন্সিলর থাকা অবস্থায় আমি দেখতাম যে, সুইপারদের সন্তানরা প্রায় সবাই স্কুলে যেত না। আমি তাদের জন্য একটি স্কুল স্থাপন করি। সেই স্কুলটা সতের বছর চালানোর পর বর্তমানে ইউনিসেফ এর দায়িত্ব নিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের রংপুর জেলার গংগাচড়ার চারটি ইউনিয়নে তৃণমূলের নারীদের উদ্যোগে ১১৫টি সংগঠন গড়ে উঠেছে, যে সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত রয়েছেন প্রায় চার হাজার নারী। এ নারীনেত্রীগণ বাল্যবিবাহ বন্ধ করা, নারী নির্যাতন রোধসহ বিভিন্ন কাজ করে আসছে। শুধু তাই নয়, বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা উদ্যোক্তা হয়ে গড়ে উঠছেন। বর্তমানে তাদের মূলধনের পরিমাণ প্রায় তিন লাখ টাকা। রংপুরে অঞ্চলে তৃণমূলে ২,৭৭৫ জন গর্ভবতী নারী ও প্রসূতি মাকে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে। ২০১৪ সালে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে ১২টি।’

sara hossainএরপর বিগত দু দশক ধরে বাংলাদেশে পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করতে লড়াই চালিয়ে যাওয়া, ২০০৯ সালে বিশ্বখ্যাত টাইম সাময়িকী কর্তৃক ‘হিরোজ অফ এনভায়রনমেন্ট’ খেতাবে ভূষিত ও র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার প্রাপ্ত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান- নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি-বেলা এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ বাংলাদেশি পাওয়ার অ্যান্ড ইন্সপিরেশন কর্তৃক বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ বাংলাদেশির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যারিস্টার সারা হোসেন- অনারারি পরিচালক, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)- কে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এ সময় সম্মাননাস্বরূপ তাঁদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। এ সময় উপস্থিত নারীনেত্রীরা তুমুল করতালি দিয়ে তাঁদের অভিনন্দন জানান। এর আগে তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন সানজিদা হক বিপাশা ও জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা।

সম্মাননা পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আপনারা জানেন যে, আমাদের কাজে রয়েছে অনেক ঝুঁকি। মাঝে মাঝে চিন্তা করি, ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো কি করবো, নাকি করবো না? আপনাদের এ সম্মেলনে এসে মনে সাহস জাগলো, ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করতেই হবে, বাধাগুলো পেরুতেই হবে। আমরা যে যার অধিকারের জন্য কাজ করি না কেনো, সকলের মূল্যবোধ কিন্তু এক। সেটা হচ্ছে- মানুষকে সম্মান দেয়া, মানুষে মানুষে যে বৈষম্য রয়েছে সেটার অবসান ঘটানো।’

ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘সমাজ উন্নয়নে আপনারা নারীনেত্রীরা যে অবদান রেখে চলেছেন তা শুনে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমার নিজের মধ্যে এ সাহস তৈরি হয়েছে যে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা আরও সক্রিয় হবো। একইসঙ্গে এটাও মনে হয়েছে যে, কেন আমরা আগে থেকেই একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলাম না। নিশ্চয়ই আজকের পর থেকে সে সুযোগ তৈরি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাল্যবিবাহ নারীদের উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা। তাই এটি বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া দরকার।’

সম্মাননা প্রদানের পর পুনরায় শুরু হয় তৃণমূলের নারীনেত্রীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট আশরাফুন্নাহার রুবি বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কাজ শুরু হয়। এরপর থেকে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে এ অঞ্চলের অনেক নারীনেত্রী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। নারীনেত্রীদের প্রচেষ্টায় বন্ধ হয়েছে অনেক বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ। ঝরে পড়া শিশুদের করা হয়েছে বিদ্যালয়গামী। আয় বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হয়েছে অন্তত ১৫ হাজার নারীকে। নারীরা সম্পৃক্ত হয়েছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্লাটফর্মে।’ নিজের জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘১৯৯৭ সালে আমি উজ্জীবক প্রশিক্ষণ এবং এবং ২০০৬ সালে ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করি। এর মাধ্যমে আমি আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠি। বর্তমানে আমি একজন পেশাদার আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং একজন প্রশিক্ষক। তাই আমি হৃদয় উজাড় করে ভালবাসা জানাচ্ছি এই বিকশিত নারী নেটওয়ার্ককে, যে নেটওয়ার্ক-এর অনুপ্রেরণায় আমি পেয়েছি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা।’

রাজশাহী অঞ্চলের পক্ষ থেকে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলা কমিটি’র আহ্বায়ক মরিয়ম শেফা বলেন, ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমাদের চিন্তা-চেতনার ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে রাজশাহী অঞ্চলের নারীনেত্রীবৃন্দ সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। তারা গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা ও শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, শিশুবিবাহ বন্ধ ও পারিবারিক বিবাদ নিরসন, পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নেয়া, শিশুদের বিদ্যালয়গামীকরণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ক প্রচারাভিযান, সমবায় সমিতি গঠন, দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ ও আয় বৃদ্ধিমূলক উদ্যোগ হাতে নিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছেন। নারীনেত্রীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৬৪টি সমিতির মাধ্যমে ১৪ শ’ নারী সংগঠিত হয়েছে, যেখানে পুঁজি দাঁড়িয়েছে ৮০ লাখ টাকা। সমিতির সদস্যরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে আয়-বৃদ্ধিমূলক কাজ পরিচালনা করছে। আমি নিজেও একজন সফল নারীনেত্রী এবং দ্বিতীয়বারের মত নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান।’

বরিশাল অঞ্চলের নারীনেত্রীদের পক্ষ থেকে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক মাদারীপুর জেলা কমিটি’র সভাপতি আনোয়ারা রাজ্জাক বলেন, ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর প্রশিক্ষণ থেকে প্রাপ্ত অনুপ্রেরণা নিয়ে আমরা তৃণমূলের নারীদের সংগঠিত করি। তাদের মধ্যে যারা লেখাপড়া জানে না, তাদেরকে করে তুলি সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। আমরা ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় বিদ্যালয়ে পাঠানো এবং শিশুশ্রম রোধ করা, নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের সহায়তা দান এবং নারী ও শিশু পাচার রোধে ভূমিকা পালন করছি। একইসঙ্গে বাড়ির আশেপাশের পতিত জমিতে শাক-সবজি আবাদ, মৎস চাষ, গরু মোটাতাজাকরণ ও হাঁস-মুরগি পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেই।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও জীবনের সাথে যুদ্ধ করে আজকের পর্যায়ে এসেছি। আমি একজন লেখিকা, ইতিমধ্যে আমার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে।’

সিলেট অঞ্চলের পক্ষ থেকে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক আড়াইসিধা ইউনিয়ন (আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) কমিটির সভাপতি আম্বিয়া বেগম বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলের পাঁচটি জেলার ১৯টি উপজেলার ৩৫৭ জন নারীনেত্রী নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে কাজ করছেন। আমরা বর্তমানে বাল্যবিবাহ রোধ, যৌতুক প্রতিরোধ, শিশুদের স্কুলগামীকরণ, নিরাপদ মাতৃত্ব, গর্ভকালীন সেবা, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন, আর্সেনিক পরীক্ষা, বৃক্ষরোপণ ও সমবায় সমিতির মাধ্যমে নারীদের আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে সম্পৃক্ত করছি। দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া, পারিবারিক সুরক্ষা আইন ইত্যাদি বিষয়ে মতবিনিময় সভা ও উঠান বৈঠক আয়োজন করি।’ তিনি বলেন, ‘আমি ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেছি, অর্জন করেছি অনেক সম্মান। বর্তমানে আমার নিজের একটি সংগঠন আছে, যার মাধ্যমে আমরা নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের পাশে দাঁড়ানো-সহ নারী ও শিশু পাচার রোধে ভূমিকা রেখে চলেছি।’

ঢাকা অঞ্চলের পক্ষ থেকে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট রাশিদা আক্তার শেলী বলেন, ‘ঢাকা অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় আমরা প্রায় পাঁচ শ’ জন নারীনেত্রী প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে কন্যাশিশু এবং নারীদের অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছি। এমডিজি অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো যে কাজ করছে সেগুলোর সাথে যোগাযোগ রেখে আমরা নারীনেত্রীরা কাজ করছি।’ নিজের জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৯৪ সালে আমি দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর সাথে যুক্ত হই। ১৯৯০ সালের আগে সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় আমি অনেক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতাম। কিন্তু বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সাথে যুক্ত হওয়ার পর আমাকে কোনো কাজ করতে দলীয় পরিচয় দিতে হয় না এবং সরকারি-বেসরকারি যে কোনো কমিটিতে তারা আমাকে সম্পৃক্ত করতে চায়। আমার আজকের এ অবস্থানে আসার জন্য আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে, এক্ষেত্রে আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক।’

কুমিল্লা অঞ্চলের নারীনেত্রী শাহানা হক বলেন, ‘একটি সুন্দর সমাজ উপহার দেয়ার জন্য শুধু শিক্ষাই নয়, এর পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশিক্ষিত মা। কুমিল্লা অঞ্চলে আমরা প্রায় ১৩ শ’ নারীকে নিরক্ষরমুক্ত করা এবং বাল্যবিবাহ থেকে মুক্ত করে অনেক কন্যাশিশুকে আমরা শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করতে পেরেছি।’ নিজের জীবন সম্পর্কে এই নারীনেত্রী বলেন, ‘এসএসসি পাশ করার আগেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি ছিলাম সামান্য একজন গৃহিণী। বিয়ের পর দু শ’ টাকা বেতনে একটা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। কিন্তু উজ্জীবক প্রশিক্ষণ আমার জীবনকে বদলে দেয়। হাঙ্গার মানে ক্ষুধা। কিন্তু এটা কী- তা জানার জন্য আমার মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়। আমি এরপর আমি ঐ বিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে নিজেই একটা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি, যেখানে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিনা বেতনে লেখাপড়া করে। আমি আশা করি, আমার স্কুলে লেখাপড়া করে প্রত্যেকেই আত্মনির্ভরশীল হবে। আমি চাই- প্রতিটি শিশু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হোক।’

চট্টগ্রাম অঞ্চলের নারীনেত্রী জান্নাতুল বকেয়া রেখা বলেন, ‘আমরা নারীরা সবসময় অসহায় ও দুর্বল ছিলাম এবং তা মনেও করতাম। কিন্তু বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর প্রশিক্ষণ শেষে আমরা বুঝতে পারলাম যে, নারীরা অসহায় নয়। নারীরাও উন্নয়ন করতে পারে এবং উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় আমার বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু আমি বিয়ের পরও শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করেই বিএ পাশ করি। ২০০৭ সালে আমি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি, যেটি ইতিমধ্যে সরকারি হয়ে গেছে। আমি নিজে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য ব্যবসাও পরিচালনা করে চলেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আপনাদের সুখবর দিতে চাই, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় সাড়ে চার শ’ নারী বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যারা কন্যাশিশু ও নারীদের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছেন।’

chumkiনারীনেত্রীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পর সম্মেলনের প্রধান অতিথি মেহের আফরোজ চুমকি এমপি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের এগিয়ে আসা প্রমাণ করে বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপি ছয় শতাংশের উপরে। আজকে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা নেই, আমরা খাদ্যে স্বয়ংস্বপূর্ণতা অর্জন করেছি। সর্বোপরি মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসসহ এমডিজি অর্জনে আমাদের সাফল্য ইর্ষণীয়। আর এসব ক্ষেত্রে নারীদের রয়েছে একটি বড় অবদান। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে নারীদের উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে উল্লেখ করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘নারীদের যেখানেই সুযোগ দেয়া হচ্ছে সেখানেই তারা যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে। আজকে দেশের রাজনীতিসহ সর্বোক্ষেত্রে নারীরা প্রতিষ্ঠিত।’ উপস্থিত নারীনেত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা এগিয়ে আসুন। নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করুন। তাহলেই সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন হবে।’

osaওসা স্কোজস্ট্রোম ফেল্ট বলেন, ‘আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ থেকে একদল প্রতিনিধিদের সাথে এখানে আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। আমি আপনাদের কথা শুনে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়েছি। আপনাদের এ অভিজ্ঞতা আমরা নিজ দেশে গিয়ে বিনিময় করবো।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও একজন নারীনেত্রী। আমি জানি, আপনাদের যে স্বপ্ন, আমারও একই স্বপ্ন। আর সে স্বপ্ন হলো- একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যত। আমি জানি, এটা বিরাট স্বপ্ন, বিরাট প্রত্যাশা। কিন্তু আমরা যখন বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর সদস্য এবং সবাই মিলে কাজ করছি- তখন এটা অসম্ভব নয়। এজন্য কন্যাশিশু তথা নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি সবাই প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হই, তাহলে এখন যেটা স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপায়িত হবে। আমি আপনাদের প্রতি অনুরোধ জানাবো- আপনারা আপনাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন এবং অন্য নারীদেরও এ নেটওয়ার্ক-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করুন।’

badiul sirড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য অভাবনীয় সাফল্য অপেক্ষা করছে। কারণ আজ দেশের নারীরা তাদের ও সমাজের অন্যান্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন হয়ে উঠেছে। যেমন, ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর উদ্যোগে সারাদেশের প্রায় সাত হাজার নারী ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন, যারা তৃণমূল পর্যায়ে স্বেচ্ছায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।’ উপস্থিত নারীনেত্রীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আজকের এ সম্মেলনেও আপনারা নিজ অর্থ ব্যয় করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সমবেত হয়েছেন। কারণ এটা আপনাদের প্রাণের সংগঠন। এজন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

এরপর নারীনেত্রীদের পক্ষ থেকে আসমা আক্তার বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন-২০১৪-এর ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঘোষণাপত্রে তিনি বলেন, ‘…আমরা জানি যে, প্রসূতি মা ও নবজাতক শিশুর মৃত্যুহার কমানো, টিকাদানসহ শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ এবং তাদের সার্বিক জীবনমানের উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু একইসঙ্গে উদ্বেগের সাথে আমরা লক্ষ করছি যে, সারাদেশে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতা ব্যাপক হারে বেড়েই চলেছে। …তাই এই সম্মেলন থেকে আমরা ঘোষণা করছি যে, এ সকল অন্যায্য ও অমানবিক অবস্থা অবসানের লক্ষ্যে এবং নারী তথা সকল নাগরিকের জন্য সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যত গঠনে আমরা বদ্ধপরিকর।… উল্লেখ্য, সম্মেলনের মিলনায়তনের বাইরে (বোর্ডের মাধ্যমে) রাখা উক্ত ঘোষণাপত্রে উপস্থিত সকল নারীনেত্রী স্বাক্ষর করেন।

সম্মেলনের ঘোষণাপত্র পাঠের পর আমন্ত্রিত অতিথি ড. গোলাম মুরশিদ বলেন, ‘কিছুকাল আগেও মনে করা হতো যে, নারীরা লেখাপড়া করলে পরিবার ও সমাজের অকল্যাণ হয়। বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। অথচ এখন নারীরা লেখাপড়ায় এগিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকটি পরীক্ষায় মেয়েরা ভাল করছে। কিন্তু একইসাথে নারীরা নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।’ তিনি বলেন, ‘নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, এটা দেখলেই গর্বে বুক ফুল ওঠে। নারীরা যদি উন্নয়ন কাজে যুক্ত হয়, তাহলে আমাদের কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না। সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে ভারত থেকে বাংলাদেশ ভাল করছে। নারীরা যদি উন্নয়নমূলক কাজে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।’

সাইদা হামিদ বলেন, ‘আমি আপনাদের (নারীনেত্রীদের) মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখেছি তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আপনাদের সফলতার অভিজ্ঞতাগুলো আমি নিজ দেশে গিয়ে বিনিময় করবো। আপনারা আজকে যে ঘোষণাপত্রে সম্মতি দিয়েছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়াসহ পুরো পৃথিবীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আপনাদের এখান থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি, যা থেকে ভারতের জন্য এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট গ্লোবাল-এর জন্য অনেক শিক্ষার বিষয় রয়েছে।’ একজন লেখক হিসেবে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এগুলো প্রকাশ করবেন বলেও জানান তিনি।

ড. রওনক জাহান বলেন, ‘নারীদের সমস্যা শুধু তাদের সমস্যা নয়। এটা সমাজেরও সমস্যা। তাই নারীদের এগিয়ে নিতে হলে পুরুষদের এগিয়ে আসতে হবে। তবে নারী নির্যাতন শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, একইসঙ্গে বিশ্বের প্রায় সবদেশের জন্যই একটি বড় সমস্যা। তাই সম্মিলিতভাবেই এ সমস্যা উত্তরণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাল্যবিবাহ নারীদের বিকাশের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তাই এটি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান সরকার বিয়ের বয়স কমানোর প্রস্তাব করেছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা বাল্যবিবাহকে আরও উৎসাহিত করবে বলে আমরা মনে করি।’

DSC_0241আমন্ত্রিত অতিথিগণের বক্তব্যের পর কর্ম অধিবেশন পর্বে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক-এর কেন্দ্রীয় কার্য-নির্বাহী কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া সম্মেলনে বিকশিত নারীনেত্রীদের মধ্য থেকে যারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মেলনের প্রধান অতিথি মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি তাদের সম্মাননা প্রদান করেন। উল্লেখ্য, উক্ত সম্মেলনে প্রতিটি অঞ্চল আলোকচিত্রের মাধ্যমে তাদের সফলতার চিত্র প্রদর্শন করে (ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে) এবং সেরা প্রদর্শনীর জন্য কুমিল্লা অঞ্চল পুরস্কার লাভ করে।

সকাল থেকেই সকল নারীনেত্রীর মুখে ছিল হাসি আর আনন্দ, একইসঙ্গে বক্তব্য আর অনুভূতি ব্যক্ত করার ক্ষেত্রেও ছিল দৃঢ় মানসিক অঙ্গীকার। সকালের সেই স্নিগ্ধ হাসি ম্লান হয়ে যায়নি সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে, তথা পড়ন্ত দুপুরেও। কারণ সম্মেলনের শেষভাগে (বিনোদন পর্বে) ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র‌্যাফেল ড্র। তাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়েই শেষ হয় তৃণমূলের নারীনেত্রীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই মিলনমেলা।