জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম-এর উদ্যোগে জাতীয় কন্যাশিশু উদযাপন: শিশুবিবাহ রোধে অঙ্গীকার গ্রহণ

DSC_0062শিশুবিবাহ বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা। এর ফলে কন্যাশিশুরা বঞ্চিত হয় শিক্ষা ও পুষ্টিসহ অন্যান্য অধিকার থেকে। তাই শিশুবিবাহ বন্ধে কন্যাশিশুদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা ও তাদেরকে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে আলাপ-আলোচনা, সচেতনতা সৃষ্টি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এমন উপলব্ধি থেকে ‘শিক্ষা-পুষ্টি নিশ্চিত করি, শিশুর বিয়ে বন্ধ করি’ ‌এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হলো জাতীয় কন্যাশিশু দিবস-২০১৪।

দিবসটি উদ্যাপন উপলক্ষে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম গ্রহণ করে নানামুখী কর্মসূচি। এরমধ্যে ছিল- বর্ণাঢ্য র‌্যালি, আলোচনা সভা, ‘কন্যাশিশ-১০’ সংকলন ও পোস্টারের মোড়ক উন্মোচন, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা। 

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ও জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম-এর যৌথ উদ্যোগে সকাল ০৮:৪৫টায় চারুকলা ইনিস্টিটিউট (শাহবাগ) এর সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়। বেলুন উড়িয়ে র‌্যালির উদ্বোধন করেন জনাব মেহের আফরোজ চুমকি এমপি- মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। র‌্যালিতে বিভিন্ন শ্লোগান সম্বলিত ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম-এর সদস্য, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ প্রায় দু হাজার জন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। র‌্যালিটি বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়।

র‌্যালি উদ্বোধন পূর্ব সমাবেশে মেহের আফরোজ চুমকী বলেন, ‘শিশুবিবাহ বাংলাদেশের জন্য এক অভিশাপ। এর ফলে যেমন বাড়ছে নারী নির্যাতন, তেমনি জন্ম নিচ্ছে প্রতিবন্ধী শিশু। মাতৃস্বাস্থ্য হয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শিশুবিবাহ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার শিশুবিবাহ বন্ধে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান শিশুবিবাহ সংক্রান্ত আইনটি বাতিল করে একটি শক্তিশালী নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে শুধুমাত্র সরকারের একার পক্ষে শিশুবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। আমরা যদি কন্যাশিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে তারা উপার্জনক্ষম এবং স্বাবলম্বী নারী হিসেবে বেড়ে ওঠতে পারবে, অবদান রাখতে পারবে সমাজ ও রাষ্ট্রে।’

DSC_0331র‌্যালি শেষে সকাল ১০:০০টায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর শহীদ মতিউর রহমান মুক্তমঞ্চে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব তারিক-উল ইসলাম- মাননীয় সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ড. বদিউল আলম মজুমদার- সভাপতি, জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ও গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ, জনাব জেমি টেরজি- কান্ট্রি ডিরেক্টর, কেয়ার বাংলাদেশ। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেগম আশরাফুন্নেসা- যুগ্ম সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, অধ্যাপক লতিফা আকন্দ- সহ-সভাপতি, জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম, জান্নাতুল ফেরদৌস রুমা- অ্যাডভাইজার, চাইল্ড প্রোটেকশন, প্ল্যান বাংলাদেশ ও নাছিমা আক্তার জলি- সম্পাদক, জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জনাব মোশাররফ হোসেন- পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী।

সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ফোরাম সম্পাদক জনাব নাছিমা আক্তার জলি। তিনি বলেন, ‘জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম ১৭৮টি সংগঠনের একটি প্লাটফরম। এই ফোরাম-এর মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে প্রতিটি সংগঠনই স্ব-স্ব সামর্থ্যরে জায়গা থেকে কন্যাশিশুদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। ফোরাম-এর উদ্যোগে আমরা মাঠ পর্যায়ে শিশুবিবাহ বন্ধে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি এ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতি প্রণয়নেও ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি।’

DSC_0182জনাব তারিক-উল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাই, আর কোন কন্যাশিশু যেন শিশুবিবাহের শিকার না হয়। এজন্য শুধু রাজধানীতে নয়, শিশুর বিবাহ বন্ধের শ্লোগানকে সামনে রেখে সারাদেশেই বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি দিবস পালিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ‘১০৯২১’ নাম্বারে ফোন করে কেউ নারী ও শিশু নির্যাতনের সংবাদ জানালে তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আমি মনে করি, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিশুবিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা চালানো।’

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘কন্যাশিশুরা গুরুত্বপূর্ণ’ এটা আমাদের বারবার করে বলতে হবে। তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কন্যাশিশুরা শিক্ষিত হলে নারীরা শিক্ষিত হয়। আর নারীরা শিক্ষিত হলে পুরো জাতি শিক্ষিত হবে। একইভাবে কন্যাশিশুরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হলে নারীরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। আর নারীরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হলে তাদের গর্ভ থেকে সুস্থ সন্তানের জন্ম হয়। এভাবেই আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু কন্যাশিশুরা শিশুবিবাহের শিকার হলে তারা শিক্ষা ও পুষ্টির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে হলে শিশুবিবাহ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

জেমি টেরজি বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। আবার এ শিশুদের ৪৮ শতাংশই হলো কন্যাশিশু। এই কন্যাশিশুদের ৬৪ শতাংশ ১৮ বছর বয়সের আগেই শিশুবিবাহের শিকার হয়, যারা শিক্ষা ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। তাই শিশুবিবাহ বন্ধ করতে না পারলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র আকারে পিছিয়ে যাবে। আমরা চাই, এমন একটি সমাজ যেখানে কন্যাশিশুরা শিক্ষিত হয়ে বড় রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী ও ডাক্তার হবে এবং নিজেদের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে।’

বেগম আশরাফুন্নেসা বলেন, ‘শিশুদের সামগ্রিক উন্নয়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র দায়িত্ব নিলে শিশুরা এগিয়ে যায়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কন্যাশিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। গার্ল সামিটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুবিবাহ বন্ধে দৃঢ় অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছেন। আশা করি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের কন্যাশিশুরা এগিয়ে যাবে।’

অধ্যাপক লতিফা আকন্দ বলেন, ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণময় দিন। এটি আমাদের জন্য গৌরবের দিন। বাংলাদেশের কন্যাশিশু তথা নারীরা এগিয়ে গিয়েছে, আমরা আরও এগিয়ে যেতে চাই। কিন্তু কন্যাশিশুদের বিকাশের জন্য অনেক দরজাই বন্ধ থাকে। এ বন্ধ দরজাগুলো আমরা খুলে দিতে চাই। কারণ আমরা চাই বিশ্ব জয় করতে।’

জান্নাতুল ফেরদৌস রুমা বলেন, ‘শিশুবিবাহের শিকার হওয়া ৭০ শতাংশ কন্যাশিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে, ৫০ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যায়। এছাড়া জন্ম নেয় অপুষ্ট শিশু। তাই শিশুবিবাহ বন্ধ করা না গেলে দেখা যাবে ৫০ বছর পর অপুষ্টরাই বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে।’ তিন বলেন, ‘শিক্ষা ও সুস্বাস্থ্য ছাড়া একজন মানুষের জীবন পরিপূর্ণ হতে পারে না। অথচ শিশুবিবাহের শিকার হওয়া কন্যাশিশুরা এ দুটো অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।’
জনাব মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কন্যাশিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারলে শিশুবিবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। শিশুদের অনেক অধিকার রয়েছে। কিন্তু অনেকেই এ ব্যাপারে সচেতন নয়। তাই শিশুদের অধিকারগুলো সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। কারণ, আমরা চাই, বৈষম্যহীন এক সমাজ।’

উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানের বিশেষ এক পর্যায়ে জাতীয় কন্যাশিশু দিবসকে কেন্দ্র করে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ৩০ জন বিশিষ্ট লেখকের লেখা সম্বলিত ‘কন্যাশিশ-১০’ প্রবন্ধ সংকলন ও পোস্টারের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষভাগে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ভাগে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।