গণ গবেষণা

বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি ও আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের হাতিয়ার গণগবেষণা
গবেষণার মূল আলোচ্য বিষয় হলো– মানুষ ও তার সমাজ। যৌথভাবে মাথা খাটানো, যৌথ অনুসন্ধান, পারস্পারিক শিখন, পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা, দলগঠন, যৌথভাবে বাস্তবায়ন ও সমাজ রূপান্তরের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার নাম গণগবেষণা। এই প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার ভেতরে থাকা জনগোষ্ঠী নিজেরা যৌথভাবে মাথা খাটাবেন, সমস্যা চিহ্নিত করবেন ও সমস্যা সমাধানের নতুন নতুন উপায় অনুসন্ধান করবেন ও তা বাস্তবায়ন করবেন।


Participatory Action Reasearch বা PAR পদ্ধতির বাংলা পরিভাষা ’গণগবেষণা’। এটি একটি সমাজ গবেষণা পদ্ধতি।

প্রতিটি মানুষ এবং প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যেই তার পরিবর্তনের শর্ত, শক্তি ও উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকে। যে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটার ক্ষেত্রে তার ভেতরের উপাদানগুলোর ভূমিকাই প্রধান। কিন্তু ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাইরের পরিবেশ বা সহায়কের ভূমিকা আবশ্যক।

গণগবেষণা সহায়ক:
গণগবেষণা প্রক্রিয়ায় সহায়কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যক। একজন সহায়ক বিশ্বাস করেন, মানুষ সৃষ্টিশীল জীব এবং মানুষের সৃষ্টিশীলতার মুক্তিই উন্নয়নের লক্ষ্য। প্রত্যেক মানুষের রয়েছে নিজস্ব জ্ঞান ও সৃজনশীল মেধা। যে কোনো আর্থ-সামাজিক অবস্থাকেই মানুষ সৃষ্টিশীলভাবে মোকাবিলা করতে পারে। মানসিক পরনির্ভরশীলতা ও উদ্যোগ নিতে অনিহার কারণে অনেক সময় মানুষের সৃষ্টিশীলতার প্রয়োগ হয় না। একজন সহায়ক মানুষের এই সৃষ্টিশীলতা জাগিয়ে তুলতে প্রণোদনা দিবেন এবং সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলবেন।

একজন সহায়কের মধ্যে তার নিজ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার সৎ আকাক্সক্ষা, সংগ্রামী চেতনা ও লড়াকু মানসিকতা থাকতে হয়। তার মধ্যে শেখার প্রবল আকাক্সক্ষা ও কৌতুহল থাকতে হয়। অন্যদের জ্ঞান, চিন্তা ও যুক্তির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা থাকতে হয়। সহায়ক তার নিজস্ব জ্ঞান, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা সামাজিক পরিবর্তন প্রক্রিয়াতে যুক্ত করেন। যুক্তি ও সংলাপ প্রক্রিয়ায় সকলের চিন্তা ও মতামতের ভিত্তিতে নতুন চিন্তা ও নতুন জ্ঞান সৃজন করতে সহযোগিতা করেন।

গণগবেষণা কর্মশালা:
গণগবেষণার সহায়ক হওয়ার উপাদানসমৃদ্ধ অসংখ্য উদ্যমী, উদ্যোগী ও লড়াকু মানুষ আমাদের সমাজে রয়েছে। গণগবেষণা ফাউন্ডেশন কোর্স ও গণগবেষণা কর্মশালার মাধ্যমে এই মানুষগুলোকেই দক্ষ সহায়ক হিসাবে তাদের গড়ে তোলা হয়। তারাই সমাজের বঞ্চিত, দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে গণগবেষণা প্রক্রিয়ায় সংগঠিত, ক্ষমতায়িত ও তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্দীপিত করেন। মানুষ হিসেবে তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতাকে জাগিয়ে তোলেন।

গণগবেষকরাই গণগবেষণার মূল শক্তি:
গণগবেষণার মূল শক্তি মানুষ। গণগবেষণা পদ্ধতির লক্ষ্য হলো– মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি ও আর্থ-সামাজিক রূপান্তর। এক্ষেত্রে গণগবেষণার অভিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হলো– সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া অংশ। তারাই গণগবেষক। নিজেরা মাথা খাঁটান, সমস্যা চিহ্নিত করেন ও সমাধানের উপায় খুঁজে বের করেন। এ প্রক্রিয়ায় সহায়ক একজন উদ্দীপকের ভূমিকা পালন করেন মাত্র।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমলেও এখনও দেশে প্রায় পাঁচ কোটি দরিদ্র মানুষ রয়েছে। সমাজের এই মানুষগুলো নিরন্তর জীবন-জীবিকার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকেন। প্রতিদিন বহুরকম বুদ্ধি প্রয়োগ করে তাদের টিকে থাকতে হয়। যারা এই অবস্থার মধ্যে বসবাস করেন তারাই সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন দারিদ্র্যের কারণ ও প্রকরণসমূহ। ফলে এই অবস্থা থেকে বের হবার উপায় সম্পর্কেও তাদেরই সবচেয়ে ভালোভাবে জানা থাকার কথা। তা সত্বেও, দারিদ্র্য বিমোচনের বিভিন্ন গবেষণায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে তেমনভাবে যুক্ত করা হয় না। তাদের মতামত ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটে না। সমাজে তাদের কোনো মর্যাদা নেই, তাদের জ্ঞানের মূল্য নেই, মালিকানা নেই। ফলে সমাজের এক বিরাট অংশের জ্ঞান, বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সমাজ। আমাদের সমাজের অনগ্রসরতার এটাই প্রধানতম কারণ।

গণগবেষণা সমিতি:
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর সহযোগিতায় গণগবেষণা প্রক্রিয়ার সংগঠিত প্রায় ৩০ হাজার (২০১৬ পর্যন্ত) দরিদ্র মানুষ। ছোট ছোট সংগঠনের মধ্যে তারা নিজেদের সংগঠিত করেছেন। তৃণমূলের এই সংগঠনগুলো ”গণগবেষণা সমিতি” বা “জিজিএস” নামে পরিচিত। ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে তারা ১ কোটি টাকার ওপর (২০১৬ পর্যন্ত) পুঁজি গঠন করেছেন। নিজেদের পুঁজি আয়বৃদ্ধি ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজে বিনিয়োগ করে তারা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করছেন। মহাজনী ও এনজিও ঋণের বেড়াজাল থেকে নিজেদের মুক্ত করছেন। কৃষিতে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার ও সৃজনশীলতার প্রয়োগ ঘটিয়ে মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা ও প্রাণবৈচিত্র প্রতিপালন করছেন। এতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আয় বৃদ্ধি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে যৌতুক ও বাল্যবিবাহের মত ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করছেন। স্বাস্থ্যচর্চা, পরিচ্ছন্নতা, পরিবারে ও প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সরকারি সেবা ও নাগরিক অধিকার আদায় করার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছেন। এছাড়া স্থানীয় ক্ষমতা এবং সরকার কাঠামোতে গণগবেষকরা রাখছেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

সহায়ক পরিবেশ পেলে মানুষের সৃজনক্ষমতা যে কতভাবে বিকশিত ও প্রকাশিত হতে পারে তার অজস্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন গণগবেষকগণ। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বিশ্বাস করে, গণগবেষকরাই গড়ে তুলতে পারবেন আগামী দিনের ক্ষুধামুক্ত, সাম্য ও শান্তির বাংলাদেশ।

যোগাযোগ: মাহমুদ হাসান রাসেল, গণগবেষণা ইউনিট, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ। ই-মেইল: Mahmud.Hasan@thp.org

1 comment

  1. মোঃ আবুল বাশার, নাটোরী

    দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশের যতগুলো ট্রেইনিং নেয়ার ও দেয়ার সুযোগ হয়েছে তার মধ্যে গণগবেষণা প্রশিক্ষণটি আমার কাছে ভাল লেগেছে। শুধু তাই নয়, এর ফলে মানুষের মনের চিন্তার যে দুয়ার খুলে যায় তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া শুরু করেছি। এতে যারা অংশ নিয়েছে অধিকাংশ সময় তাঁরা তাদের সমস্যাকে নিজেই সমাধান করার প্রচেষ্টা করছেন। আমার মনে হয় এই অংশটি আরও বৃদ্ধি করা দরকার বা বেশি বেশি এই প্রশিক্ষণ জণগণের মধ্যে ছড়ানো দরকার। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.