আমাদের কার্যক্রম

দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর কর্মসূচি

ক. স্বেচ্ছাব্রতী উজ্জীবক তৈরি
প্রত্যেক এলাকার বা ইউনিয়নে অগ্রসর নারী-পুরুষদের মধ্য থেকে বাছাইকৃত একদল মানুষকে চার দিনের উজ্জীবক প্রশিক্ষণের (মূলতঃ স্ব-শিক্ষণের) মাধ্যমে স্বেচ্ছাব্রতী উজ্জীবক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এমন আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মোপলব্ধি সৃষ্টি করা, যাতে তারা নিজেদের অফুরন্ত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে বদ্ধপরিকর হন। একইসাথে স্থানীয় নেতৃত্ব হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিজ নিজ এলাকায় অনুঘটক হিসাবে কাজ করতে এগিয়ে আসে। প্রত্যেক উজ্জীবক এমন একজন স্বেচ্ছাব্রতী মানুষ যিনি নিজ দায়িত্বে আপন ভাগ্য গড়ে এবং অন্যকে তার ভাগ্য গড়তে উজ্জীবিত ও ক্ষমতায়িত করে। মূলতঃ স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে এলাকার উন্নয়নে নিবেদিত থাকার মাধ্যমে সারাদেশে বর্তমানে দেড় লক্ষাধিক উজ্জীবক ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কাজে  অনবদ্য ভূমিকা রাখছে। একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার কারণে উজ্জীবকরা এখন একটি সংগঠিত সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর এ সকল উজ্জীবকই দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর কার্যক্রম পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি।

খ. ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রশিক্ষণ ও বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সীমাহীন বৈষম্য ও বঞ্চনার মধ্য রেখে ক্ষুধামুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নপূরণ অসম্ভব। এ উপলব্ধি থেকে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট নারী নেতৃত্ব বিকাশের প্রয়োজনে সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ের একদল নারীকে সংগঠিত, ক্ষমতায়িত ও তাদের সামর্থ্য বিকাশের লক্ষ্যে নিবিড় ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ-কর্মশালা পরিচালনা করে আসছে। প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপ এবং ভিত্তি হলো ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ’ শীর্ষক ফাউন্ডেশন কোর্স। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একঝাঁক নারী নেতৃত্ব বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানিসহ নারীর প্রতি সকল সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারাভিযান পরিচালনা করছে এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। বর্তমানে প্রায় দশ হাজার নারীনেত্রী তাদের যার যার অবস্থান থেকে সামাজিক দায়বদ্ধার ভিত্তিতে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। এসব তৃণমূল থেকে উঠে আসা নতুন প্রজন্মের নারীনেত্রীরা ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলছে এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

গ. ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার
সংগঠনটি পরিচালিত হয় ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা এবং মূলতঃ তাদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। তরুণ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মেধা ও সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানো এবং তাদের মধ্যে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মানসিকতা সৃষ্টি করা। এ পর্যন্ত ২১,০০০ এর অধিক প্রশিক্ষিত ‘ইয়ূথ লিডার’ সমাজ গঠনের কাজে নানামুখী অবদান রাখছে। এর সদস্যগণ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করার মাধ্যমে শিক্ষা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নারীর অবস্থান পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও প্রচারাভিযান পরিচালনা করছে। বর্তমানে তারা ‘অ্যাকটিভ সিটিজেন ইয়ূথ লিডারশিপ ট্রেনিং’ পরিচালনা ও বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। সারা দেশে গণিত অলিম্পিয়াড পরিচালনা করছে। বর্তমানে প্রায় এক লাখ ছেলে-মেয়ে ‘ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার’-এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ এবং তাদের কণ্ঠকে উচ্চকিত করার লক্ষ্যে ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার ও বৃটিশ কাউন্সিল-এর যৌথ অংশীদারিত্বে বর্তমানে ‘ইয়ূথ পার্লামেন্ট’ গঠনের উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে।

ঘ. গণগবেষণা
গণগবেষণার মূল শক্তি সমাজের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী। সামাজিকভাবে বঞ্চিত, ক্ষমতাহীন, অসমতার শিকার এই মানুষগুলোই দারিদ্র্যের কারণগুলো সম্পর্কে সবচাইতে ভালো জানে। তারা সমস্যাগুলো নিয়ে নিজেরা মাথা খাটালে সমাধানের সবচাইতে ভালো উপায় বের করতে পারে। গণগবেষণা প্রক্রিয়ায় নিজেদের সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে গবেষণার মূল কাজটি তারাই করে। তারা নিজেরা দারিদ্র্যের কারণ ও প্রকরণগুলো চিহ্নিত করে। গণগবেষণার এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় তারা নিজেরাই নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনে একটি সংগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়ে ওঠে। সমাজে তাদের নেতৃত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর গণগবেষণা ইউনিটের উদ্যোগ ও সহায়তায় বর্তমানে সাত শতাধিক সমিতিতে বিশ হাজারের অধিক দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষ গণগবেষণার সাথে যুক্ত রয়েছে।

ঙ. স্বেচ্ছাব্রতী প্রশিক্ষক
স্বেচ্ছাব্রতী প্রশিক্ষকগণ ক্ষুধামুক্তি আন্দোলনের মূল অনুঘটক। প্রতিশ্র“তিশীল অগ্রসর উজ্জীবকদের পক্ষ থেকে কিছু ব্যক্তিকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্বেচ্ছাব্রতী প্রশিক্ষক হিসেবে তৈরি করা হয়। এই প্রশিক্ষণ অংশগ্রহণকারীদের নেতৃত্বকে শাণিত করে, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাব্রতী হিসেবে দায়িত্ব নিতে অনুপ্রেরণা যোগায় এবং প্রশিক্ষণ পরিচালনায় দক্ষ করে তোলে। এছাড়াও তাদের প্রশিক্ষণোত্তর সামর্থ্য বিকাশের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে প্রায় আট শত স্বেচ্ছাব্রতী প্রশিক্ষক সারাদেশে উজ্জীবক প্রশিক্ষণ পরিচালনা ও কর্মশালা পরিচালনাসহ জনগণকে সংগঠিত করে গণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিচালিত সকল কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

চ. ‘প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্রম’ বিষয়ক কর্মশালা
স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রত্যাশা জাগানো এবং তাদের উজ্জীবিত ও সংগঠিত করার কাজ শুরু হয় ‘প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্রম’ বিষয়ক কর্মশালার মধ্য দিয়ে। এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে মানুষ নতুনভাবে ভাবতে শেখে এবং অনুধাবন করতে পারে যে, তারা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যত বিনির্মাণের মূল কারিগর। এ কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা ক্ষুধামুক্ত এলাকার ভিশন বা প্রত্যাশা তৈরি করে, অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রম চিহ্নিত করে এবং মূলতঃ স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের জন্য কার্যক্রম শুরু করে।

ছ. ‘সামাজিক সম্প্রীতি ও নাগরিকত্ব’ বিষয়ক কর্মশালা
নাগরিক সচেতনতা তৈরি ও সামাজিক সম্প্রীতি সৃদৃঢ় করার জন্য সারাদেশে ‘সামাজিক সম্প্রীতি ও নাগরিকত্ব’ বিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করা হয়। আমাদের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে ’প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। নাগরিকগণ শুধু নিজেকে মালিক ভেবে ঘরে বসে থাকলে হবে না। প্রকৃত মালিক হলো সে, যে সচেতন, সক্রিয়, সোচ্চার, স্বাধীন, কর্তব্য পালন করে এবং দায়িত্ব নেয়। কর্মশালার মধ্য দিয়ে নাগরিকদের মধ্যে অধিকার, দায়বদ্ধতা, সম্প্রীতিবোধ ও করণীয় বিষয়ক সচেতনতা তৈরি করা হয়।

জ. দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশটির রয়েছে অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিশাল জনশক্তি। এই বিশাল জনশক্তির জীবন-জীবিকার নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়তার জন্য দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বিভিন্ন আয়বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে। স্থানীয় চাহিদা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে উজ্জীবক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে দুই ভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে: (১) মাস্টার ট্রেইনার সৃষ্টি ও তাদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদান, এবং (২) সরাসরি স্থানীয় উজ্জীবক ও জনগণকে প্রশিক্ষণ প্রদান। সংগঠনের উদ্যোগে দর্জি বিজ্ঞান, ব্লক-বাটিক, হস্তশিল্প, মৌ চাষ, আঙ্গুর চাষ, নার্সারি প্রতিষ্ঠা, মাশরুম চাষ, বসত বাড়িতে সবজি চাষ, মাছ চাষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন ও কম্পিউটার শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

ঝ. দূষণমুক্ত ও টেকসই পরিবেশ উন্নয়ন বিষয়ক কার্যক্রম
দূষণমুক্ত পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এবং স্বেচ্ছাব্রতী উজ্জীবকবৃন্দ সারাদেশে বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালনা করছে। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন’ এর সক্রিয় সদস্য। সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রচারাভিযান পরিচালনা, বিভিন্ন দিবস পালন ও অন্যান্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে পরিবেশ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। এছাড়াও ঢাকার উজ্জীবকদের উদ্যোগে বিশিষ্ট নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে ‘বাঁচান-বাঁচাতে চাই নগর’ নামে একটি স্বেচ্ছাব্রতী ফোরাম গঠন করা হয়েছে।

3 comments

  1. mizan al mim

    i am currently an undergraduate student at dhaka. How can i get involved or volunteer with thp,bd? Please let me know.

    1. sarwarthp

      Dear Mizan, You can contact with our YEH team. Youth Ending Hunger, 3/7, Asad Avenue, Mohammadpur, Dhaka-1207. Phone: +880 2 8127975

Leave a Reply to mizan al mim Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.